আজ ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সময় : বিকাল ৫:৫৪

বার : বৃহস্পতিবার

ঋতু : শরৎকাল

র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ মানবাধিকার কমিশনের

৪২ দিন গুম করে রাখার অভিযোগ

র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ মানবাধিকার কমিশনের

ছয় বছর আগে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ৪২ দিন গুম করে রাখার অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ওই ব্যবসায়ীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমের নেতৃত্বে দ্বৈত বেঞ্চের প্রথম শুনানি শেষে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এই আদেশ দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার কমিশন থেকে ওই আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

মানবাধিকার কমিশনের এই আদেশে বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখসহ অপহরণের এই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করে অভিযোগকারীর নিরাপত্তাসহ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কমিশনকে অবহিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে বলা হয়। আগামী ৩১ মার্চ এই অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর বরাতে কমিশনের আদেশে বলা হয়, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার (অপারেশন) র‌্যাব-এ থাকাকালীন অভিযোগকারীকে অপহরণের কাজটি করিয়েছিলেন। যা র‌্যাবের ডিজি জানতেন এবং ডিবির কাছেও তথ্য আছে মর্মে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারী তার ও পরিবারের নিরাপত্তাসহ এই ঘটনার তদন্তপূর্বক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে অভিযোগকারী কমিশনে আবেদন করেন।

অভিযোগকারীর বরাতে কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, রাজধানীর ইন্দিরা রোডের লেক্সাস ডেভেলপারস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে একটি অভিযোগ (নম্বর-২৯/২২) দায়ের করেন। অভিযোগে বেল্লাল হোসেন বলেন, লেক্সাস কুয়াকাটা সিটি নামে একটি প্রকল্পের কতিপয় গ্রাহককে চুক্তি সম্পাদন করে জমির মূল্য বকেয়া রেখে সাফ কবলা রেজিস্ট্রেশন মূলে প্লট হস্তান্তর করে দেওয়া হয়। গ্রহীতারা কিস্তির টাকা যথাযথভাবে পরিশোধ করার অঙ্গীকার করলেও তারা ওই টাকা পরিশোধ করছেন না। অভিযোগকারীর ব্যবসায়িক পার্টনার জসিম উদ্দিন চক্রান্ত করে সাজ্জাদ আহমেদ ও ডা. শহিদুল বারীর যোগসাজশে লেক্সাস কুয়াকাটা সিটি প্রকল্পটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। দখলে ব্যর্থ হয়ে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর  অভিযোগকারীকে (ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন) অপহরণ করা হয়।

তবে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধান বলছে, মানবাধিকার কমিশনের আদেশে অপহরণ ও গুমের ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের সাবেক যে কর্মকর্তার কথা বলা হয়েছে, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার সে সময় র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন না। তিনি ২০১৯ সালের ১৯ জুন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। পৌনে দুই বছর র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালের মার্চ মাসে তিনি নিজ বাহিনীতে ফিরে যান। অপহরণ ও গুমের এই ঘটনার সময় র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান। আর সে সময়ে র‌্যাবের ডিজি বা মহাপরিচালক ছিলেন বর্তমান পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ।

সম্প্রতি র‌্যাবের এই সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ছয় কর্মকর্তা ও র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তথা র‌্যাবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। কূটনৈতিক নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা করছে সরকার।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম জানান, কোনও কর্নেলের নাম উল্লেখ করে তো চিঠি দেওয়ার কথা নয়। আদেশের কপিটি না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না।

মানবাধিকার কমিশন থেকে চিঠি পাওয়ার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৫ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী বিষয়টি অনুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠান। ৩ মার্চ পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (ক্রাইম ইস্ট, অতিরিক্ত দায়িত্বে ক্রাইম মেট্রো) জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ঢাকার পুলিশ কমিশনারকে অনুসন্ধানপূর্বক মহামতসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার অনুরোধ করেন। যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন  বলেন, ‘এ ধরনের কোনও চিঠি আমার হাতে এখনও পৌঁছেনি। যদি এরকম কোনও তদন্তের আদেশ আসে, আমরা অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখবো। আমরা অতীতেও র‌্যাবের কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।’

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তবে অভিযুক্ত যে কর্মকর্তার কথা বলেছেন, তিনি তো সে সময়ে র‌্যাবে ছিলেন না। তার মানে অভিযোগেই গড়মিল রয়েছে। আর এতবছর পর কেন তিনি অভিযোগ করলেন সেটিও ভাববার বিষয়। এছাড়া হরহামেশাই র‌্যাব পরিচয়ে এক শ্রেণীর দুস্কৃতিকারী নানারকম অপঘটন ঘটিয়ে চলছে। আমরা মাঝে মধ্যেই ভুয়া র‌্যাব-পুলিশ গ্রেফতার করছি। সেরকম কোনও চক্র এটি ঘটিয়েছে কিনা, প্রয়োজনে তাও খতিয়ে দেখা হবে।’ র‌্যাব বা র‌্যাবের কোনও সদস্যদের আইনবর্হিভূত কোনও কর্মকাণ্ড করার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যদিও সোমবারই (২১ মার্চ) ঢাকায় সেন্টার ফর গর্ভন্যান্স স্টাডিজ বাংলাদেশে গুমের ঘটনা নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুমের বেশি অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের ডিস্টিংগুয়িশ ফেলো ড. আলী রিয়াজের নেতৃত্বে করা এই গবেষণায় গত তিন বছরে ৭১টি গুমের ঘটনার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি গুমের ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০০৭ সাল থেকে ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়। ৮৯ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আর বিভিন্ন মেয়াদে গুম থাকার পর ৫৭ জন ফেরত এসেছেন। গুম থেকে ফেরত আসার পর বেশিরভাগই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চান না।

সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যে ব্যবসায়ীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, সেই বেল্লাল হোসেনের ইন্দিরা রোডের অফিসে গিয়ে প্রথম দিন তাকে পাওয়া যায়নি। তার একজন সহকর্মীর মাধ্যমে পরিচয় দিয়ে কথা বলার প্রসঙ্গে জানানো হলে তিনি একদিন পর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে দেখা করতে বলেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ের নিচ তলায় বসে কথা হয় ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেনের সঙ্গে।

বেল্লাল হোসেন জানান, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে তাকে একটি কালো গ্লাসের হায়েস গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। গাড়িতে তুলেই তার হাত ও চোখ মুখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর ৪০ মিনিটের মতো গাড়ি চালিয়ে কোনও একটা অন্ধকার ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে ৪২ দিন আটকে রাখা হয়। এর মধ্যে তাকে পটুয়াখালীতে লেক্সাস কুয়াকাটা সিটির জমির গ্রহীতা কারও কাছে আর টাকা চাওয়া যাবে না বলে শাঁসানো হয়েছিল। ৪২ দিন পর নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজ এলাকায় একই কায়দায় গাড়িতে করে তাকে নামিয়ে দিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ধারীরা।

বেল্লাল হোসেন বলেন, ‘অপহরণ করার আগে আমাকে তিন বার র‌্যাব কার্যালয় থেকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাদের ডাকে আমি সাড়া দেইনি। মুক্তি পাওয়ার পর বুঝি র‌্যাব সদস্যরাই আমাকে অপহরণ করেছিল।’

এতদিন পর মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, আগের ব্যক্তিরা আবারও তাকে অপহরণ করানোর জন্য পাঁয়তারা করছেন বলে তিনি কিছু সিমটম পাচ্ছেন। তার ব্যবসায়িক শত্রুরা যাতে আবারও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও ইউনিটকে ব্যবহার করে তাকে তুলে নিতে না পারে, সেজন্য তিনি মানবাধিকার কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান। তবে অভিযোগের কপি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে রাজি হননি।

র‌্যাবের সাবেক যে কর্মকর্তার কথা বলা হচ্ছে তিনি সে সময়ে দায়িত্বে ছিলেন না জানালে বেল্লাল হোসেন বলেন, ‘নামটা ভুল হতে পারে, অন্য যিনি ছিলেন তিনি করতে পারেন। তদন্ত করলেই তো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।’ এরপরই ভীতসন্ত্রস্ত ব্যবসায়ী বেলাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘র‌্যাবের বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই। আমার ব্যবসায়িক শত্রুরা যাতে আর কাউকে ব্যবহার করে আমার ক্ষতি করতে না পারে, আমি সেটাই চাই।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তো পুরনো। অতীতেও আমরা দেখেছি দুই-একটি ঘটনায় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেগুলোর কোনও জবাব আসেনি। এটারও কোনও জবাব আসবে কিনা বা যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। একইসঙ্গে একটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই না করেই মানবাধিকার কমিশনের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এতে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যাবে। সেটি ইচ্ছে করেই করা হয়েছে কিনা তাও গুরুত্বপূর্ণ।’

নূর খান লিটন বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন অনেক কিছুই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে যেরকম গুরুত্ব দেওয়া উচিত, সেরকম গরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     More News Of This Category